ভ্রমণ

একদিনের বরিশাল


  • নুসরাত রুষা  |
  • প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:২৮
একদিনের বরিশাল
ছবি: উপমা দত্ত

শীতভরা সকালে জীবনজয়ীর ছোট একটি টিমের সদস্য হয়ে বরিশালের পথে রওনা দিলাম। যাত্রা শুরু ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে থেকে। এটা ডে ট্রিপ। পদ্মা সেতুর বরাতে ঢাকা-বরিশাল যাওয়া-আসা এখন কিছু না। যাচ্ছি আমি, সাইদুর ও গালিব। সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। বরিশালে আমাদের কাজ হচ্ছে আড্ডা দেওয়া আর একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে গল্প করা। ভাবা যায়! সেদিন ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ২০ তারিখ।

ভোরের মাওয়ামুখী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে কুয়াশা আর দিনের প্রথম আলোর খেলা পুরো অন্য রকম এক সৌন্দর্য তৈরি করছিল। আর আমার মন ভরে যাচ্ছিল নতুন দিনের প্রত্যাশায়। পদ্মা সেতু পাড়ি দিতে দিতে সূর্যোদয় দেখলাম। সে এক অপরূপ সৌন্দর্য।

মাদারীপুরে নাশতার বিরতি নিলাম। নাশতার সময় আমাদের আলাপচারিতা জীবনজয়ীর আরেকটি চায়ের আড্ডার মতো হয়ে উঠল। নাস্তা শেষ। গাড়ি চলতে শুরু করল বরিশাল, মানে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। পথে কোনো বিলম্ব নেই। ঠিকঠাক সময়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছানো গেল।

(এখানে পড়ুন: বুকুলেইকি: ফুলে ভরা মণিপুরী এক গ্রাম)

ছোট্ট ক্যাম্পাস। জীবনজয়ীর বরিশাল শাখার সদস্যদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেলাম। বিশেষ কোনো আলাপে যাওয়া হলো না। তবু কথা চলল। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ছিল, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। বিদায়ের সময় চেয়ারপার্সনকে আমি বললাম, ‘দোয়া করবেন যেন জীবনে সফল হতে পারি।’ ম্যাডাম হেসে বললেন, ‘তুমিতো এখনই সফল। তুমি যাদের সঙ্গে কাজকর্ম কর, তাতেই তুমি ধনী।’ এই ছোট্ট কথাটা মনে ধরে রাখার মতো।

ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে বরিশাল শহর। ছবির মতো গোছানো একটি বইয়ের বিপণিতে গেলাম আমরা। নামটিও বেশ; নির্বাচিত। এখন নাম পালটে হয়েছে বনলতা বুক ক্যাফে। বরিশালের একটি বইয়ের বিপণির নাম এর চেয়ে সুন্দর আর কী-ইবা হতে পারে! বনলতা আসলে শুধু একটা বইয়ের স্টল নয়। একটা সেন্টারও বটে। বরিশালের বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের লোকেরা এখানে নিয়মিত আসেন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয় সবসময়। 

সারা দেশে যেখানে বইয়ের দোকান দিন দিন বিরল হয়ে উঠছে, সেখানে এমন একটি নান্দনিক, বইয়ের ভুবন যেন স্বস্তির আশ্রয়। চারদিকে শুধু বই আর বই। পরিচালক নিজে একজন সাহিত্যমোদী মানুষ। বনলতার বইয়ের সংগ্রহ সত্যি প্রশংসা করার মতো। আছে নানা দেশের সাহিত্য, ইতিহাস ও রাজনীতির বই। চোখে পড়ল ছবি ও তথ্যচিত্রবিষয়ক গ্রন্থও। বসে বই পড়ার আরামদায়ক ব্যবস্থাও আছে। চোখে পড়ল কয়েকজন কলেজপড়ুয়া তরুণ ও মধ্যবয়সী পাঠক মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছেন। আমরা থাকতে থাকতেই কয়েকজন ক্রেতা এলেন। দেখে ভালো লাগল, মানুষ এখনো বই কিনছে। সঙ্গে আছে চায়ের ব্যবস্থাও। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীসহ সব বইপ্রেমী মানুষের জন্য জায়গাটি সত্যিই এক অপূর্ব আশ্রয়।

(এখানে পড়ুন: বাংলায় বতুতা) 

জীবনজয়ীর ‘কথা বলি’ বিভাগের আলাপের জন্য বনলতায় আগে থেকেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শিল্প-সংস্কৃতি-সমাজসেবার সঙ্গে জড়িত তিনজন দারুণ মানুষ। আমার কথা হয় অক্সফোর্ড মিশন হাইস্কুলের সিনিয়র শিক্ষক দিপালী বাইনের সঙ্গে। অসাধারণ সংস্কৃতিমনা একজন মানুষ তিনি। পরিবার, বন্ধু, জীবন সবকিছু নিয়ে আলোচনা হলো। তিনি আমাকে কিছু মূল্যবান উপদেশ দিলেন। মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে, কোনো বিষয়ে অতিউৎসাহী না হতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে বললেন। দিপালী ম্যাডাম বরিশালের গার্ল গাইডের সঙ্গে যুক্ত। আর, কী আশ্চর্য, আমার পরিচিত একজন ম্যাডাম তাঁর ঘনিষ্ঠ। ভাবলাম, বাংলাদেশে যেখানেই যাই না কেন, পরিচিত মানুষের সুতো ঠিকই খুঁজে পাই।

কথায় কথায় সময় বেশ বয়ে গেল। পড়ন্ত বিকেল। এবার আমরা ফেরার পথ ধরলাম।

যাত্রাবিরতিতে গৌরনদীর বিখ্যাত দই-মিষ্টি খাওয়া হলো। পুরো পথে আমাদের আলাপ আর থামল না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়, সভ্যতা-সংস্কৃতি সব নিয়েই আমরা কথা বলেছি।

সারাটা দিন ছিল ভ্রমণ, শেখা এবং মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতার এক অবিস্মরণীয় সমাহার। আমি জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি, অনেক জায়গায় গিয়েছি। কিন্তু বরিশাল ভ্রমণের দিনটি আমার কাছে বিশেষ কিছু হয়ে রয়ে গিয়েছে। 

(এখানে পড়ুন: চারু দিদির বাড়ি) 


ক্যাটাগরি: ভ্রমণ

         

  রেটিং: ৫

এই বিভাগের আরও পোস্ট